বিজয় দিবস রচনা- ২০ পয়েন্ট (ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির জন্য)
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, তোমাদের জন্য "বিজয় দিবস" রচনা নিয়ে আজকের আর্টিকেলে আমি হাজির হয়েছি। আমাদের জীবনে বিজয় দিবসের গুরুত্ব ও চেতনা ধরে রাখতে "বিজয় দিবস" রচনাটি ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পড়ানো হয়।
বিজয় দিবস রচনাটি তোমরা যারা নতুন আঙ্গিকে ও ইউনিক ভাবে লিখতে চাও তাদের জন্য আজকে রচনাটি বিশেষ উপকারে আসবে আশা করি। কারণ রচনার ২০টি পয়েন্ট এর প্রতিটি পয়েন্ট অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নতুনত্ব নিয়ে লেখা হয়েছে। তোমরা তোমাদের শ্রেণী অনুযায়ী পয়েন্ট গুলো লিখে রাখতে পারো। পোস্ট সূচিপত্রঃ
তাহলে চলো দেরি না করে মূল রচনাটি শুরু করা যাক।
আরো পড়ুনঃ বাংলাদেশের নদ নদী রচনা-২০টি পয়েন্ট
বিজয় দিবস
ভূমিকাঃ
"কাল যেখানে পরাজয়ের কালো সন্ধ্যা হয়
আজ সেখানে নতুন করে রৌদ্র লিখে জয়"
পটভূমিঃ
দীর্ঘ ২০০ বছর শাসনের পর ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা অবশেষে এ ভূখণ্ড ছেড়ে চলে যায়। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়-পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান, যারা আবার পশ্চিম পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীল ছিল। প্রথমে এটি স্বাধীনতার পথ মনে হলেও পাকিস্তান আমাদের মৌলিক অধিকার ধীরে ধীরে কেড়ে নিতে শুরু করে।
আরো পড়ুনঃ দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান রচনা-২০টি পয়েন্ট
এই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তানে হতে থাকে ৫২ ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন ইত্যাদি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরঙ্কুশ জয় হলেও নানা কারণ দেখিয়ে পাকিস্তান শাসক শাসন ক্ষমতা এদেশের নেতার কাছে দেয় না। এ নিয়ে আন্দোলন শুরু হলে ২৫ শে মার্চ কালো রাতে গণহত্যার মাধ্যমে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যা ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
বিজয়ের প্রকৃত অর্থঃ
১৬ই ডিসেম্বর আমরা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব পেয়েছি। মূল যুদ্ধ আগের দিন বন্ধ হলেও সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা এই দিন অর্জন করেছি বলেই এই দিন বিজয় দিবস। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থ যুদ্ধ বন্ধ হওয়া না, বিজয়ের প্রকৃত অর্থ মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব অর্জন, যা আমরা,১৬ই ডিসেম্বর অর্জন করেছি।
স্বাধীনতা সংগ্রামঃ
স্বাধীনতার জন্য এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ- নারী, পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, কৃষক, শিক্ষক, ধনী-গরিব সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে এই মাতৃভূমিকে বাঁচাতে। দীর্ঘ নয় মাসের এই মুক্তিকামী সংগ্রামে পাকিস্তানিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি কেউ। পাকিস্তানিরা ঢাকার রাজার বাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সহ সারা দেশে আক্রমণ করে অত্যাচার শুরু করে।
এই সময় পাকিস্তানিদের রুখতে দেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, প্রতিটি সেক্টরে ছিল একজন সেক্টর কমান্ডার। এছাড়া গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। মূলতঃ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ভাষণ প্রত্যেক বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে।
সাধারণ মানুষের অবদানঃ
এই বিজয় দিবস শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমেই অর্জিত হয়নি। এতে সাধারণ মানুষেরও অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, কৃষক শিক্ষক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আপামর জনতা এই মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য থেকে শুরু করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে তথ্য সরবরাহ করে সকল উপায়ে সাহায্য করেছে। বিজয়ের এই দিনে তাদের কেউ শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হয়।
বিজয়ে নারীদের অবদানঃ
স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার কথা আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পারি। অনেক নারী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কেউ বা সেবা দানকারী কেউ আবার গোপন খবর প্রদানকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, খাবার ও থাকার জায়গা দিয়ে দেশের অনেক নারী স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রেখেছেন।
তাই বিজয় দিবসে নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে স্মরণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নারীদের বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারের নারীদের বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করা হয়।
মিত্র দেশগুলোর সাহায্যঃ
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সহ ছোট বড় বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়ে এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। যৌথ বাহিনীর প্রায় অর্ধেক ভারতীয় সেনা ছিল। এছাড়াও ভারতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল।
আরো পড়ুনঃ ছাত্র জীবন রচনা-২০ পয়েন্ট
এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেওয়া হতো ভারত থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধ বিরতি বিলম্ব করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে সপ্তম নৌবহর পাঠালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পাল্টা নৌবহর পাঠায়। এভাবে মিত্র দেশগুলো আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করেছিল। তাই প্রতিবছর বিজয় দিবসে মিত্র দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশ সরকার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানায়।
আন্তর্জাতিক সমর্থনঃ
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই বিদেশি মিডিয়া ও সাংবাদিকদের মধ্যে আমাদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম নজরে পড়ে। বহির বিশ্বে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের বার্তা এই সকল সাংবাদিক ভাইয়েরা পৌঁছে দেয়। এই কাজে বাংলাদেশি সাংবাদিকগণও সহযোগিতা করেন। দুইজন শহীদ সাংবাদিক হলেন, শহীদ নিজামউদ্দিন ও শহীদ নাজমুল হক।
এছাড়াও যখন বিদেশী সাংবাদিকদের পাকিস্তানিরা নিজেদের সমর্থনের জন্য নিয়ে আসে তখন সাংবাদিকগণ তাদের প্ররোচনায় না পড়ে সত্য কথা বহিঃ বিশ্বে জানিয়ে দেয়। এভাবে বিদেশি সাংবাদিকদের ভূমিকার কারণে সারা বিশ্ব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে পারে।
বিজয়ের বিপক্ষ দলঃ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের কিছু অকৃতজ্ঞ মানুষ দেশের বিপক্ষে অংশ নেয়। এদেশের সন্তান হয়ে রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না থেকে পাকিস্তানিদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। পাকিস্তানিদের বাংলাদেশের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে, বিখ্যাত ব্যক্তিদের অবস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলোর ঠিকানা বলে দিয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করে। এই ধরনের কিছু মানুষ স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকলেও বাংলার প্রতিটি মানুষের দেশের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ এর বিনিময়ে আমরা আমাদের বিজয় লাভ করেছি।
স্বাধীনতা লাভঃ
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাঙালি জাতি অর্জন করে কাঙ্খিত স্বাধীনতা। মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর একযোগে আক্রমণের ফলে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে বিকেল ৫টায় পাকিস্তানের বাহিনীর পক্ষ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন। এবং এই আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন লেফটেন্যান্ট জগজিৎ সিং অরোরা। তবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন।
বিজয় দিবস উদযাপনঃ
প্রতিবছর ১৬ ই ডিসেম্বর বাঙালি জাতি এ দিনকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে বরণ করে নেয়। এই দিন ভোরে সাভার স্মৃতি সৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালতে উড়তে থাকে লাল সবুজ পতাকা। বিশেষ এই দিনে দেশে জাতীয় ছুটি পালন করা হয়। টিভি ও রেডিও চ্যানেলগুলোতে সারাদিন চলে বিজয়ের অনুষ্ঠান মালা। দেশের স্কুল, কলেজ গুলোতে বিশেষ কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই দিন পালন করা হয়।
বিজয় দিবসের চেতনাঃ
বিজয় দিবস দেশপ্রেমকে জাগ্রত করে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সহ যারা যোদ্ধাদের সাহায্য করেছে, তাদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে শিখি। দেশ আমাদের, এটি রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের- প্রতি বছর বিজয় দিবসে আমরা নতুন করে তা উপলব্ধি করতে পারি।
বিজয় দিবসের গুরুত্বঃ
স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের পাশাপাশি ঘর ছাড়তে হয়েছে এক কোটি মানুষের। দেশের প্রতিটি মুক্তিকামি মানুষের এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাধীনতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাই। সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম এই বিজয়ের মাধ্যমে ধারণা লাভ করে। মানুষের মধ্যে দেশ প্রেমের চেতনা জাগ্রত হয়।
বিজয় দিবস আমাদের মধ্যে গড়ে তোলে ভবিষ্যতের উন্নতি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অটুট অনুপ্রেরণা। এই বিজয় আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
আমাদের জীবনে বিজয় দিবসের গুরুত্বঃ
আমাদের জীবনে বিজয় দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। বিজয় আমাদের চেতনা, নতুন কিছু করার উদ্যম। বিজয় দিবস আমাদের শেখায় কিভাবে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে নতুনকে জয় করতে হয়। সকল বাধা-বিপত্তি বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে জীবনে সফল হতে হয়। বিজয়ের চেতনাকে ধারণ করে আমরা আমাদের জীবনে এগিয়ে যাব-এই হোক আমাদের বিজয় দিবসে অঙ্গীকার।
উপসংহারঃ
১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। আজ থেকে 55 বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। বিজয় দিবস আমাদের অহংকার, বিজয় আমাদের গর্ব। বিজয় দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও সুন্দর দেশ গড়ে তুলবো এই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

passiondrivefiona র নীতিমালা মেনে comment করুন। প্রতিটি comment রিভিউ করা হয়;
comment url